ভালবাসার একটি রোমান্টিক গল্প

Online track bangla help24

 বৃষ্টির পরের রোদ


টাঙ্গাইলের পুরোনো শহরের এক কোণে, যেখানে লালমাটির রাস্তা এখনও পাকা হয়নি, সেখানে একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি। দোতলার বারান্দায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাঁড়াতো মেয়েটা। নাম তার নীলা।
নীলার বয়স তখন সাতাশ। চাকরি করে ঢাকায়, কিন্তু প্রতি শুক্র-শনি বাড়ি ফেরে। বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। বিয়ের কথা অনেকবার উঠেছে, কিন্তু নীলা বলে, “আমার এখনো মন বসেনি।” সত্যি বলতে, মন বসার মতো কাউকে সে কখনো দেখেইনি।
এক শুক্রবার বিকেলে আকাশ কালো করে এলো। ঘন কালো মেঘ। বাতাসে মাটির গন্ধ। নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল—রাস্তার ওপারে একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে আসছে। হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দ। আকাশ ফেটে পড়ল বৃষ্টি।
ছেলেটা তাড়াতাড়ি সাইকেল থামিয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়াল। কিন্তু গাছের পাতা ফুটো করে পানি পড়ছে। সে ভিজতে ভিজতে হাসছে। নীলা দেখল—ছেলেটার চোখে একটা অদ্ভুত আলো। যেন বৃষ্টিটা তার জন্যই নেমেছে।
নীলা নিজেও জানে না কেন, সে ছাতা হাতে নিচে নেমে গেল।
“এই দিকে আসুন, ভিজে যাবেন।”
ছেলেটা চমকে তাকাল। তারপর হাসল।
“আমি তো ভিজতেই চাই।”
“তবু আসুন। আমার বাড়ির বারান্দায় অন্তত দাঁড়ান।”
ছেলেটা সাইকেল ঠেলে এলো। নাম তার রিয়াদ। টাঙ্গাইল কলেজের নতুন লেকচারার। বয়স তিরিশ। গ্রামের ছেলে, কিন্তু পড়াশোনা করে ঢাকা থেকে এসেছে।
সেদিন বৃষ্টি থামতে থামতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগল। রিয়াদ বলল তার ছোটবেলার গল্প—কীভাবে বর্ষায় নদীতে সাঁতার কাটত, কীভাবে কাগজের নৌকা ভাসাত। নীলা বলল তার ঢাকার অফিসের গল্প, ট্রাফিক জ্যাম, মিটিং, বসের বকা।
রাত নামার আগে রিয়াদ বলল,
“আমি কাল সকালে আবার আসব। একটা বই নিয়ে আসব। পড়তে চাইলে শুনিয়ে যাব।”
নীলা হাসল। “আসবেন।”
পরের দিন সকালে রিয়াদ এলো। হাতে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’। দুজনে বসল বারান্দায়। রিয়াদ পড়তে লাগল। তার গলা ছিল গভীর, একটু খসখসে। নীলা চোখ বন্ধ করে শুনছিল।
দিন যেতে লাগল। প্রতি শুক্র-শনি রিয়াদ আসত। কখনো বই নিয়ে, কখনো গানের কথা নিয়ে, কখনো শুধু চুপচাপ বসে থাকত। নীলা বুঝতে পারছিল—তার মনটা আর আগের মতো খালি নেই। কিন্তু সে কিছু বলছিল না। ভয় হচ্ছিল।
এক শনিবার সন্ধ্যায় আকাশ আবার কালো হলো। এবার বৃষ্টি নামল না। শুধু ঝড়ো হাওয়া। রিয়াদ এলো। হাতে একটা ছোট চিঠির খাম।
“এটা তোমার জন্য।”
নীলা খামটা নিল। ভিতরে একটা কবিতা। রিয়াদের লেখা।
তুমি যখন হাসো
আমার বুকের ভিতরে একটা নদী বয়ে যায়
শান্ত, গভীর, কিন্তু উচ্ছ্বাসে ভরা
আমি জানি না এই নদী কোথায় যাবে
শুধু জানি—আমি এই নদীতে ডুব দিতে চাই।
নীলার চোখ ভিজে এলো।
“তুমি এতদিন চুপ ছিলে কেন?”
“ভয় পেয়েছিলাম। তুমি যদি না চাও…”
নীলা মাথা নাড়ল।
“আমিও তো ভয় পেয়েছিলাম।”
সেদিন প্রথমবার তারা হাত ধরল। আঙুলে আঙুল জড়িয়ে। কোনো কথা নেই। শুধু হাওয়া আর দূরের ব্যাঙের ডাক।
কিন্তু গল্পটা এত সহজে শেষ হয়নি।
নীলার বাবা-মা জানতে পারলেন। তারা চাইছিলেন মেয়ের বিয়ে হোক শহরের কোনো ভালো পরিবারে। রিয়াদ তো গ্রামের ছেলে, লেকচারার হলেও বেতন কম। বাবা বললেন,
“তোর ভবিষ্যৎ নষ্ট করব না।”
নীলা কাঁদল। অনেক। কিন্তু বলল,
“বাবা, আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না।”
এক বছর কেটে গেল। অনেক ঝগড়া, অনেক কান্না, অনেক রাত জেগে থাকা। রিয়াদ কখনো হাল ছাড়েনি। প্রতি সপ্তাহে আসত। কখনো ফুল নিয়ে, কখনো নীলার পছন্দের চকলেট নিয়ে।
একদিন নীলার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হার্টের সমস্যা। হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তার বললেন—অপারেশন করতে হবে। অনেক টাকা লাগবে।
রিয়াদ সেদিন রাতে এলো। হাতে একটা খাম।
“এটা আমার সব সঞ্চয়। নাও।”
নীলা অবাক।
“তুমি পাগল হয়ে গেছ? এটা তো তোমার সবকিছু!”
“তোমার বাবা আমারও বাবা।”
সেদিন নীলার বাবা বুঝলেন—ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, কাজেও হয়।
অপারেশন সফল হলো। বাবা সুস্থ হলেন।
আরও ছয় মাস পর একটা শীতের সকালে, টাঙ্গাইলের পুরোনো মসজিদের পাশে ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান। নীলা লাল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে। রিয়াদ সাদা পাঞ্জাবি।
কাজী সাহেব বললেন,
“কবুল?”
দুজনেই একসাথে বলল,
“কবুল।”
বিয়ের পর প্রথম রাতে নীলা রিয়াদের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
“জানো, আমি ভেবেছিলাম—ভালোবাসা মানে শুধু হাসি আর কবিতা। কিন্তু তুমি আমাকে দেখিয়েছ—ভালোবাসা মানে একসাথে ঝড় পার করা।”
রিয়াদ হাসল।
“আর আমি ভেবেছিলাম—ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া। কিন্তু তুমি আমাকে শিখিয়েছ—ভালোবাসা মানে দেওয়া।”
সেই রাতে আকাশে চাঁদ ছিল না। কিন্তু দুজনের চোখে এত আলো যে, ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠেছিল।
বছর দুয়েক পর।
একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে। টাঙ্গাইলেই। নীলা এখনো চাকরি করে। রিয়াদ এখনো পড়ায়। কিন্তু এখন তাদের আরেকজন আছে—ছোট্ট একটা মেয়ে। নাম রাখা হয়েছে “বৃষ্টি”।
প্রতি বিকেলে নীলা বারান্দায় দাঁড়ায়। রিয়াদ বই হাতে এসে বসে। বৃষ্টি দৌড়ে এসে দুজনের মাঝে বসে।
আর রিয়াদ পড়তে থাকে—
“তুমি যখন হাসো…”
নীলা হাসে।
“আর আমার বুকের ভিতরে একটা নদী বয়ে যায়…”
দুজনে একসাথে বলে ওঠে,
“…শান্ত, গভীর, কিন্তু উচ্ছ্বাসে ভরা।”
আর বাইরে যদি বৃষ্টি নামে—তারা আর ছুটে যায় না। শুধু হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ তারা জানে—
বৃষ্টির পরের রোদ সবচেয়ে সুন্দর।


Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default